March 27, 2017

আঁকাআঁকি নিয়ে কথা

আঁকাআঁকি নিয়ে কিছু কথা ভাগাভাগি করে নেয়া যাক। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে যা যা মাঝে মাঝে মনে হয় তা বললে যদি অন্য কারো কিছুটা হলেও কাজে লাগে বা চিন্তার খোরাক জোগায় তাহলে খারাপ কী? প্রথমে কিছু ঝামেলার কথা বলা যাক। আঁকতে গিয়ে আঁকিয়েরা বেশ কিছু অদ্ভূত সমস্যায় পড়েন। (এখানে আঁকিয়ে বলতে আমি মূলতঃ যারা মূলধারায় কিছুটা হলেও পেশাদারী আঁকা আকতে চাচ্ছেন তাদের কথাই বলছি শখের বশে দাগাদাগি যারা করেন তাদের কথা না।) সমস্যাগুলি অনেকটা এইরকম-

১. আঁকা ভালো হয় না
২. টাকা পাই না
৩. আমার বয়সী অন্যরা তো কতকিছু করে ফেলল, আমি কবে করব?
৪. ড্রিম প্রজেক্ট কবে হবে?

আমি নিজে এই সমস্ত সমস্যার মধ্যে দিয়ে গেছি, ভাবতে ভাবতে আমার নিজের মত করে কিছু উত্তর বের করেছি এ সবের। সেগুলি বলা যাক।

১. আঁকা ভালো হয় না

যে কোন আঁকাআঁকির ব্লগ , আর্টিকেল, বই বা সব বড়ো শিল্পীরা এক বাক্যে বলবেন - প্র্যাক্টিস কর। এটা আসলে আমার কাছে একটা দায়সারা উত্তর লাগে। প্র্যাকটিস তো অবশ্যই করব। এবং শর্টকাট বলে কিছু নাই তাও তো জানি। কিন্তু কথা হল কী প্র্যাকটিস করব? কিভাবে করব? প্র্যাকটিস করলেই হবে? যদি সারাজীবন ভুল জিনিস প্র্যাকটিস করি? আমি মনে করি এর উত্তর দেবার আগে নিজের কাছে অন্য দুটো প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।


  • আপনি কী করতে চান / হতে চান?
  • আপনার সামর্থ্য কট্টুকু?

মানে আপনি আঁকাআঁকির কোন শাখায় কাজ করতে চান? ইলাসট্রেশন, গ্রাফিক ডিজাইনার, এনিমেটর, ক্যারিকেচারিস্ট, ক্যারেক্টার ডিজাইনার, কমিক্স আর্টিস্ট, লোগো ডিজাইনার, পেইন্টিং, ক্রাফট মেকিং, স্কাল্পটিং - আসলে অসংখ্য মাধ্যম আছে চারদিকে, এবং সেই সবের মধ্যে আবার আছে ছোটখাটো শাখা প্রশাখা। তারা একে অন্যের সাথে সম্পর্কিত হলেও সবাই আবার নিজেরা নিজেরা আলাদা। সুতরাং আপনি আসলে কী হতে চান সেটা ভেবে বের করা খুবই জরুরী। এক বসাতেই এটা ভেবে বের করে ফেলা হয় না, প্রসেসটা একটু সময়সাপেক্ষ। এটা বের করার উপায় হল বিভিন্ন ধরনের কাজ করে যাওয়া একটু একটু করে। আপনি নিজে যেটায় বেশী মজা পাবেন সেটাই করুন। ব্যাপারটা আসলে আনন্দ পাওয়া না পাওয়ায়, কত ভালো হল বা কোনটা সবাই করছে তাতে কিছু যায় আসে না। এই জিনিসটা জানতে পারা জরুরী। প্রথম থেকে ফোকাস না হলে দেখা যাবে আপনি খুবই অস্থির হয়ে একবার থৃডি, একবার ফ্ল্যাশ এর এনিমেশন একবার ক্যারিকেচার ইত্যাদি করে মাখিয়ে ফেলেছেন শেষে টাকা ধার করে বানাচ্ছেন ফিল্ম বা ডকুমেন্টারি। তার মানে প্রথম কাজ হল আপনি কী করবেন সেটা ঠিক করা এবং তার পরের প্রতিটা কাজ বা প্রাকটিসের উদ্দেশ্য হবে সেই কাজকে এগিয়ে নেয়া। ধরা যাক আপনি পলিটিক্যাল কার্টুনিস্ট হবন। তার মানে আপনি এখন যাই করেন নে কেন তার প্রথম উদ্দেশ্য হবে পলিটিকাল কার্টুন বোঝা ও দেখা। পলিটিক্স বোঝা-খুব একটা সহজ কাজ না- এই কাজকে ভালো করতে হয়ত চলে আসবে প্রচুর পড়াশোনা করা, ক্যারিকেচার করা। চলে আসবে প্রিন্টিং সম্পর্কে জ্ঞান, মানে কোন কাগজে কি ধরনের কাজের প্রিন্ট কেমন আসে সেটা। অর্থাৎ আপনার পলিটিক্যাল কার্টুন আরো ভালো করতে দিন দিন আরো নতুন জিনিস শিখে যাচ্ছেন। তবে উদ্দেশ্য সেই কার্টুনটাকে আরো ভালো করা। দেখা যাবে শেষমেশ আপনি এভাবে আরো অনেক কিছুই শিখে গেছেন কিন্তু সেটা একেবারেই প্যানিকড না হয়ে। তার মানে কী হতে চান বা করতে চান সেটাই প্রথম কাজ। এখন কথা হল মাল্টিটাস্কড আর্টিস্ট কি তবে হবে না? মানে যে ক্যারিকেচার করে সে কি কমিক্স করবে না? অবশ্যই করবে কিন্তু যে কোন একটা তার মূল আইডেন্টিটি থাকলে মাল্টিটাস্কিং করতেও সুবিধা হয়। নিজে যদি বুঝে যান এনাটমি আপনার কাজ না, আপনি এটা পারছেন না, আপনার আরো সহজে অন্য কিছু করার আছে, আপনার ভালো লাগে একেবারেই চাইল্ডিশ ড্র্যইং করতে- তবে সেটাই করুন। প্রত্যেকটা মানুষ তার নিজস্ব স্টাইল নিয়ে জন্মায় অন্যদের দেখে দেখে সে সেটা হারিয়ে ফেলে। সেটা আবার যে খুঁজে বের করে সবাইকে দেখাতে পারে সেই শিল্পী। আমি তাই মনে করি। আপনার একেবারে যা-তা ধরনের ড্রয়িংও একেবারেই আপনার নিজের মত ব্যাপার আছে সেটাকে হাইয়েস্ট লেভেলে নিয়ে যান- পৃথিবীতে আপনি ইউনিক হয়ে থাকবেন।

আর সামর্থ্য বোঝা মানে হল চাণক্যের সেই কথাটা- একটা কাজ শুরু করার আগে সেটা করার সামর্থ্য আপনার আছে কি না সেটা বুঝে নেয়া। কথার কথা আপনার ইচ্ছা আপনি ডিজনির এনিমেটেড মুভির মত মুভি বানাবেন। কিন্তু সেটা এই মুহূর্তে একা শুরু করাটা স্রেফ বোকামী ছাড়া আর কিছুই না। নিজের সামর্থ্য যট্টুকু সেটার আলোকেই ভাবা দরকার। ব্যাপারটা এমন না যে ওইরকম মুভি বানানোর স্বপ্ন আপনি দেখবেন না, ব্যাপারটা হল এই মুহূর্তে যেটা অসম্ভব সেটার পিছনে সময় না দিয়ে সেটা ড্রিম হিসেবে তুলে রেখে সে লক্ষ্যে এগোতে থাকা।


২. টাকা পাই না

এটি একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। বিশ্বাস না হলে পৃথিবী বিখ্যাত আর্টিস্ট ক্যারেক্টার ডিজাইনার বা কমিকস শিল্পীদের সাক্ষাতকার পড়েন। আসলে এটা একটা চোর পুলিশ খেলা। আপনি চাইবেন সর্বচ্চ মূল্যে আপনার কাজ বিক্রি করতে আর ক্লায়েন্ট চাইবে সর্বনিম্ন দামে সেটা কিনতে। আর আমাদের দেশের একটা সমস্যা হল পেশাদারিত্ব কোনদিকেই তেমনভাবে গড়ে ওঠেনি। আর্টিস্ট ও কেলাস, আর ক্লায়েন্ট পারলে কাজ নিয়ে পলানোর তালে থাকে। দুই দিকেই সমস্যা আছে। এটা এড়ানোর কোন ধ্বনন্তরি এখনো জানা যায়নি তবে প্রচলিত একটা পদ্ধতি হল কাগজে কলমে বোঝাপড়া করে নেয়া। মানে কয়টা কাজ, কী রেটে করতে রাজী হচ্ছি দুই পক্ষই সেটা আগে ঠিক করে নেয়া।

আমি যা করি সেটা আর কিছুই না, ক্লায়েন্টের কাজ আগে বুঝে নেই। তারপর একটা স্যাম্পল তাকে দেখানো হয় যে কাজটা এমন হবে। তারপরে সেটার মজুরি কেমন হবে সেটা বলি। ক্লায়েন্ট রাজী হলেই কেবল ফাইনাল কাজে হাত দেই। ব্যাপারটা আরো বিশদ বলতে আমার ইচ্ছে আছে আরেকটা আলাদা পোস্ট লেখা। আপাতত টাকা সমস্যার সমাধান এভাবে করা যেতে পারে,

- প্রথমত: নিজের কাজ অনেক ভাল করা। তাতে মার্কেটে একটা ডিমান্ড তৈরী হবে। এ ক্ষেত্রে অনেক টাকা নেই কিন্তু প্রচার হবে এমন কাজ বেসী বেশী করা যেতে পারে আগে। ভাল কাজ যদি মোটামুটি রকমের প্রচার ও পায় তবে সেটা অনেক কাজের। 

- ব্র্যান্ডিং তৈরী করা, নিজের একটা ব্র্যান্ডিং তৈরী করতে বিশেষ কিছু কাজ বেশী বেশী করা ভাল।/ যেমন ক্যারিকেচার হয়ত আমি ভাল পারি। তবে আমার মূল ব্র্যান্ডিং সেটাই হওয়া উচিত। অনেকেই আজকাল যেটাতে টাকা বেশী সেটা করছে, ফলে শেষমেশ তার তেমন কোন ব্র্যান্ড দাঁড়াচ্ছে না। এটা শেষমেশ কিন্তু একটা বিপদই হয়ে দাঁড়ায়। যে কোন একটা মূল আইডেন্টিটি জরুরি বলে মনে করি আমি। সেটা হলে নির্দিষ্ট সময় ধরে ভাল কাজ করে গেলে টাকা না পাবার কিছু নেই। তবে হ্যাঁ, নিজের ভালরকম পেশাদার হতে হবে, আলসেমী করে জোড়াতালির কাজ করে ক্লায়েন্টের উলটা দোষ ধরা কাজের কথা না।

৩. আমার বয়সী অন্যরা তো কতকিছু করে ফেলল, আমি কবে করব?


আপনার বয়সী আরো অনেক আবার একেবারেই কিছু করেও নি। তারমানে সবসময়েই আপনি আপনার চেয়ে ভাল ও খারাপ দুই দলকেই তুলনা করার জন্যে পাচ্ছেন, ভাল বুদ্ধি হল- এইগুলি নিয়ে একেবারেই না ভাবা। অনেক দারুণ আঁকিয়েকে আমি জানি যারা নিজে দারুণ আঁকেন কিন্তু 'বাইরের ওরা' তো আমার চেয়ে ভাল আঁকে এটা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন আর তাদের কাজ স্ক্রল করে করে দিন কাটান। অন্যের কাজ অবশ্যই দেখতে হবে, তাদের থেকে শিখতেও হবে; কিন্তু তুলনা করতে গেলেই আপনি শেষ। আমার কাজ অন্যের চেয়ে খারাপ- তাহলে ভাল করা যাক, এরকম ভাবলে ঠিক আছে। কিন্তু, আমার বয়সী ওই আর্টিস্ট তো অলরেডি মাস্টার লেভেলে চলে গেছে আমার আর এঁকে কী হবে, এই ভাবনাটা খারাপ। এবং এইরকম ভাবার মানেও নেই। কারণ প্রত্যেকটা আর্টিস্ট আলাদা। অবশ্যই আঁকার মূল ব্যকরণ যত ভাল রপ্ত হবে তত ভাল আঁকা হবে, কিন্তু শিল্পীরা কিন্তু খালি আঁকেন না, তারা আসলে আঁকার মধ্য দিয়ে তাদের একটা বক্তব্য তুলে ধরেন। সেটা যত সুন্দর ও নাটকীয় করে করা যায় ততই সেটা ভাল শিল্প। আর সেটা করতে গেলেই ব্যকরণ জানার প্রসংগ আসে। কিন্তু দুইজন শিল্পী একই জিনিস দেখে একেবারে একই শিল্প তৈরী করবে না। তাদের বক্তব্য আলাদা হবেই। সেটাই আসল জায়গা। অন্যের আঁকা আমার চেয়ে আলোকবর্ষ দূরের ভাল হতে পারে, কিন্তু আমার সাথে তার পার্থক্য হল সে কখনই আমার বক্তব্যটা দেবে না, সেটা পৃথিবীতে দিতে পারি আমি একাই। আর কাজ ভাল করার প্রতিযোগিতাটা নিজের সাথে নিজের। অন্যের সাথে ক্রিয়েটিভ কাজ কখনই তূলনা করার মানে নেই।

৪. ড্রিম প্রজেক্ট কবে হবে?

চাইলেই হবে। তবে তার জন্যে বাস্তব প্ল্যান করতে হবে। আমি আজকে মাত্র আঁকতে বসলাম আর ভাবলাম এক বছরের মধ্যে পিকজার এর মত এনিমেশন কার্টুন ফিল্ম বানাবো তাহলে সেটা হবে অনেকটা সাঁতার শেখার বই পড়তে বসে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেবার প্ল্যান করার মত। অবশ্যই এনিমেশন ফিল্ম বানাতে হবে। তবে তার আগে আঁকা শিখতে হবে, জানতে হবে এনিমেশন কিভাবে করে। আর অবশ্যই অর্থনৈতিক বাজেট টা করে নিতে হবে। এটা শুনতে অবাক লাগলেও আমার প্রজেক্ট করতে কত টাকা লাগতে পারে তার একটা ধারনা থাকা ভাল। বা উল্টোও করা যেতে পারে যে আমার সামর্থ্য কত আছে সেই অনুযায়ী প্রডাকশন ডিজাইন করে নেয়া যায়। যেমন একটা ক্লাসিক্যাল সেল এনিমেশন (দ্বিমাত্রিক) বানাতে সেকেন্ড প্রতি আন্তর্জাতিক রেট বলা যায় সাত হাজার টাকা। এটা বাংলাদেশের বর্তমান বাজারের প্রেক্ষাপটে প্রায় অসম্ভব একটা সংখ্যা। এখন যদি আমরা ঠিক করি আমাদের বাজার সেকেন্ড প্রতি ২ হাজার টাকা দিতে পারবে, তবে সেভাবে প্ল্যান করা যেতে পারে। হতেই পারে সেটা হাতে আঁকা এনিমেশন না হয়ে পাপেট আর স্টপ মোশন মিলানো একটা নতুন আইডিয়া। এবং সেটা আমার আয়ত্ত্বের মধ্যে আমার দুই বন্ধুকে নিয়ে ঘরে বসে একটা সেট বানিয়ে কর ফেলা সম্ভব। এভাবে ছোট করে একটা প্রামাণ্য কিছু বানালে সুযোগ আসতেই পারে যে কোন ভাল ব্যবসায়ী সেটা দেখে আমার ড্রিম প্রজেক্টে লগ্নি করল। সেই সাথে অবশ্যই নিজের সর্বস্ব ঢেলে কাজ করতে হবে। আবার বাস্তব সম্মতভাবে যা করতে যাচ্ছি সেটার অর্থনৈতিক আর কারিগরি দিক আমার আয়ত্ত্বে আছে কিনা সেটাও দেখতে হবে। আমার নিজের ড্রিম প্রজেক্ট ছিল বাংলা কমিক্স করা। সেটার জন্যে আমাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৭ বছর, আমি নিশ্চিত এ সময়ের কাউকে এতটা সময় অপেক্ষা করতে হবে না। কিন্তু তারপরেও সেতা হুট করে হয়ে যাবে এমন ভাবলে কাজটা আদৌ আর হবেই না।

এই ধরনের পোস্ট আদৌ অন্যের অকটুটুকু কাজে আসবে জানি না, তবে এগুলি মূলত: নিজেকেই বারবার শোনানো, বারবার মনে করিয়ে দেয়া। ততটুকু হলেও চলবে। আঁকাআঁকি সম্পর্কিতি যে কোন কিছু আর কেউ জানতে চাইলে আমাকে এখানেই কমেন্টে জানাতে পারেন, যথাসাধ্য চেষ্টা করব সেটা নিয়ে আমার ভাবনা জানাতে।

2 comments: