March 16, 2017

আমার পড়া ভাল বই ০২ঃ ভোলগা থেকে গঙ্গা




আইডিয়া পাওয়া বা ক্রিয়েটিভ কাজ ইত্যাদিকে এখনো আমাদের সমাজে একটা অলৌকিক প্রতিভা হিসেবে ভাবা হয়। কিছু ক্ষেত্রে ব্যাপারটা সত্যও বটে। তবে আমি মনে করি মহা ট্যালেন্টেড হয়েও লাভ নেই যদি আপনি নিজে না পড়েন, বা না দেখেন। ধরা যাক আপনি দারুণ শক্তিশালী একটা কম্পিউটার এর মত। দুর্দান্ত প্রসেসর, টেরা টেরা স্টোরেজ, র‍্যাম এর তো কথাই নাই, গ্রাফিক্স ও সেই রকম। আমি বলতে পারি আপনি দারুণ ট্যালেন্টেড একটা কম্পিউটার- বা মানুষ। কিন্তু সেই কম্পিউটার এ যদি কোন সফটওয়ার ই না ইন্সটল করি? যদি কোন ডেটাই না থাকে? তবে আপনি কী প্রসেস করবেন? কাজই বা কী করবেন? তার মানে আপনার কাজ করার জন্যে দরকার উপাদান। সফটওয়ার লাগবে, লাগবে ডেটা। সেই ডেটা প্রসেস করে ভাল গ্রাফিক্স এর পর সেটা আপনি পুর্নাঙ্গ একটা কাজ আকারে শেষ করবেন।  মানুষের ক্ষেত্রে সমস্যাটা হল সে কোন কম্পিউটার না যে কয়েকটা সিডি বা পেন ড্রাইভ থেকে কিছু জিনিস কপি পেস্ট করে ভরে দিলাম, আর সে সব বুঝে গেল। তার বুঝতে হয় নিজের চারিদিক থেকে দেখে দেখে, শুনে শুনে। তবে কেউ যদি সারাজীবন তার আশপাশ থেকে সব দেখে ফেলে বা শুনে ফেলে তারপরেও কিন্তু বিশাল যেই মানব সভ্যতার ইতিহাস তার কিছুই তার জানা হবে না। এই সমস্যার একটা দারুণ সমাধান হল বই। যে বই চাইলেই হাজার বছর আগের একটা মানুষ বা একদল মানুষ কী ভাবতো তা জানিয়ে দিতে পারে।

বই এর এখনো কোন বিকল্প মানুষ তৈরী করতে পারে নি। যতই ভিডিও দেখি, গান শুনি, আলোচনা করি, বইয়ের একটা আলাদা জায়গা থেকেই যাচ্ছে। যেখানে লেখকের আর পাঠকের মধ্যে আর কারো আনাগোনা নেই।  তাই আমাকে যখনই কেউ জিজ্ঞেস করে- এমনকি কার্টুনের ক্ষেত্রেও, যে কিভাবে আইডিয়া পাব, আমার একমাত্র উত্তর হয়- বই পড়া। এর পরেই যেই প্রশ্নটা আসে সেটা হল কী বই পড়ব? আসলে এটা বলা কঠিন। যে যেই জিননিসটা সম্পর্কে জানতে বা বুঝতে চায় তাকে সেই ধরনের বই পড়তে হবে। আর শুধুমাত্র আনন্দের জন্যে পড়াও অনেক জরুরী। তারপরেও আমার পড়া বেশ কিছু দারুণ বই ধীরে ধীরে ছোটোখাট রিভিউ ধরনের করে তুলে দিতে চাচ্ছি। তার ফলে পরিচিত অপরিচিত কেউ হয়ত উপকার পেতেও পারেন।

আজকের বই -
ভোলগা থেকে গঙ্গা
আবারো রাহুল সাংকৃত্যায়ন। ভবঘুরে শাস্ত্রের আগে বরং এই বইটা পড়েছিলাম। প্রথম পড়েছি ইউনাইটেড ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরি থেকে ধার করে, সেখানে আমার বন্ধুরা পড়ত। ধার করে দুই দিন ধরে সেটা পড়ে ফেরত দিয়ে সোজা নীলক্ষেতে গিয়ে দুই কপি কিনেছিলাম মনে আছে। এক কপি আর কোন ভাল পাঠককে গিফট করতে। এই কাজটা আমি মাঝে মাঝেই করি। খুব ভাল বই অন্য কারোর সাথে শেয়ার করতে ইচ্ছে করে। ভোলগা থেকে গঙ্গা যে আমি কতবার পড়েছি এখন বলতে পারবো না। আরো অনেকেই যারা পড়েছেন তারা হয়ত কারণটা বুঝবে না।  রাহুল এখানে এমন একটা সত্য সময়ের স্বাপ্নিক ছবি এঁকেছেন ইতিহাসের মোড়কে মুড়ে যে অজান্তেই পাঠক এক লহমায় হাজার বছর ঘুরে আসার একটা আমেজ পাবে। আমার নিজের প্রাচীন ভারতবর্ষ নিয়ে একটা রোমান্টিসিজম আছে, কালিদাসের মেঘদূত এ কারণে আমি বেশ কয়েকবার পড়েছি। প্রিয় বইয়ের মধ্যে মৈত্রেয় জাতকও চলে এসেছে তাই। আর ভোলগা থেকে গঙ্গা যে এই সব কিছুর প্রথম পাঠ আমার জন্যে তা বলাই বাহুল্য।

বইটি রাহুলজী শুরু করেছেন প্রাচীন কাল থেকে, রাশিয়ার ভোলগা নদীর তীর থেকে, সেখানে খ্রিস্টপূর্ব ৬০০০ অব্দ থেকে তখনো 'মানুষ' এর অবয়ব পায়নি এমন কিছু প্রাগৈতিহাসিক প্রাণিদের গল্প থেকে শুরু। তারপর চমতকার ভাবে তিনি সময়ের সাথে সাথে এই বিরাট স্রোতধারার তীর ধরে ধরে এগিয়েছেন ভারতবর্ষের দিকে। শেষ হয়েছে এসে গঙ্গার তীরে। শেষ করেছেন 'সুমের' নামক অধ্যায়ে: ১৯৪২ এ এসে। এঁর ঠিক পরের  খণ্ড হল 'কনৈলা কি কথা'। সেখানে ভারতবর্ষের স্বরাজ পর্যন্ত সময়কে ধরা হয়েছে। দুই খণ্ড একত্রে মিলেই পাওয়া যায় এখন।

ভোলগা থেকে গঙ্গা অসংখ্য ইতিহাস ও পুরাণ গ্রন্থের সহায়তায় লেখা। ভাল লাগার মূল জায়গাটা হল এঁর একেবারে নৈর্ব্যাক্তিক ভাবে বলা খুবই আবেগবহুল কাহিনী। আর এই বইয়ের যেই কথাটা আমার মনে গেঁথে গেছে সেটা ছিল এরকমঃ এই পৃথিবী যদি তার বুকে ঘটে যাওয়া সব কথা বলতে পারত তবে ইতিহাস অন্য রকম হত।- হুবহু এমন ছিলো না , স্মৃতি থেকে লিখছি। কিন্তু কথাটার ভাবটা এইরকমই ছিল। 

আপাত দৃষ্টিতে সরাসরি অধ্যায়গুলি/ গল্পগুলির যোগাযোগ না থাকলেও আবার কোথায় যেন তারা ধারাবাহিক একটাই গল্প। প্রাচীন রাশিয়ান ঊনমানুষদের ধীরে ধীরে ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ার গল্প, আর্য জাতির উত্থানের গল্প, বৈদিক যুগের গল্প। সবার উপরে- মানুষের গল্প।

যারা প্রাচীন ইতিহাস, সমাজ ও নৃতত্ত্ব ভালোবাসেন তাদের জন্যে সবসময় সাথে রাখার মত একটা বই এই ভোলগা থেকে গঙ্গা।

একটা অনলাইন পিডিএফ পেলাম এই লিংকে। তবে এটা কিনে সংগ্রহে রাখাই ভাল। প্রায় সব ভাল বইয়ের দোকানেই পাবেন, নীলক্ষেতের ফুটপাতেও এঁর উর্বর চাষ হচ্ছে। সেখানেও দেখতে পারেন।

No comments:

Post a Comment