May 27, 2020

বিদায় নজরুল ভাই...

এই করোনার কঠিন সময়ে আরো কত জনকে বিদায় দিতে হবে জানি না। কার্টুনিস্ট নজরুল ভাই চলে গেলেন, যদিও তিনি করোনা ভাইরাসের কারনে মারা গেছেন এমনটা জানা যায় নি। লিভারের জটিলতায় ভুগছিলেন অনেক দিন থেকেই। কিন্তু আমরা যারা তাঁর কাছাকাছি আসার সুযোগ পেয়েছিলাম তারা জানি, লিভারের চাইতেও অনেক বড় জটিলতা নিয়ে ঘুরছিলেন তিনি তাঁর মস্তিষ্কে।
আমি মনে করি তাঁর সম্পর্কে সেই ঘটনাটা সবার জানা উচিত-

১৯৭১ সাল, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী একে একে আক্রমণ করে চলেছে আমাদের দেশের আনাচ কানাচ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সব ক'টা হলে ঢুকে ছাত্রদের সার দিয়ে দাঁড়া করিয়ে গুলি করে মেরে ফেলে রেখেছে, এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করছে কাক কুকুর আর পাক বাহিনী। নিউ মার্কেটের পেছনের দিকে থাকায় একটি হল তাদের চোখ এড়িয়ে গিয়েছিলো, সেখানেই হলের এক রুমে শাহনেওয়াজ নামের আরেক ছাত্রের সাথে রুমমেট হিসেবে থাকতেন নজরুল ভাই। পাক বাহিনী অবশেষে খবর পেয়ে সেখানে হানা দিলো। তল্লাশীতে ধরা পড়ে গেলেন নজরুল ভাই আর শাহনেওয়াজ। তাঁদের নিমেষে এক সারিতে দাঁড়া করালো আর্মি, হুকুম হল- ফায়ার। দু'জনেই গুলি খেয়ে পড়ে গেলেন, শাহনেওয়াজ সাথে সাথেই মারা গেলেন। নজরুল ভাই তখনো মারা যান নি, এবং তাঁর ভাষ্যমতে,
-তখনো মরিনি, কিন্তু নড়াচরা করলে যদি বুঝে ফেলে মরিনি তবে হয়ত আবার বেয়োনেট চার্জ করবে, তাই মরার ভান করে পড়ে রইলাম।
বেশ অনেক্ষণ পরে পাক বাহিনী চলে গেলে হলের এক ঝাড়ুদার তাঁর আর্তনাদ শুনে তাঁকে বাঁচায়। যুদ্ধের প্রায় পুরোটা সময় তিনি চিকৎসাধীন ছিলেন। তাঁর সেই রুমমেট শাহনেওয়াজের নামেই পরে এই হলের নাম হয় শাহনেওয়াজ হল।

নজরুল ভাইয়ের এই বেঁচে যাওয়াটা ছিল খুবই আশ্চর্জনক , তবে বিপদের তখনো শেষ হয়নি। নজরুল ভাই বলেছিলেন ঠিক ওই মুহুর্তে কোন এক আশ্চর্য কারণে তিনি কোন ভয়ই পান নাই, এমনকি গুলি করে মারা হবে দেখেও তাঁর ভয়ের বদলে কাজ করেছে প্রচণ্ড ঘৃণা। কিন্তু দেশ স্বাধীন হবার কিছুদিন পরেই হঠাত করে প্রচণ্ড আতংকে তাঁর মাথা খারাপের মত হয়ে গেল! ডাক্তার দেখে বললেন আসলে সেই সময় তাঁর অবচেতন তাঁকে কোন একভাবে রক্ষা করেছিলো, ভয় পেতে দেয় নি। এখন যখন সব স্বাভাবিক তখন সেই চেপে রাখা মৃত্যু ভয় বের হতে চাইছে। কী ভয়ানক! এভাবে প্রায় বছর পাঁচেক প্রবল আতংকে তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ  হয়ে গিয়েছিলেন, এর পরেও থেকে থেকে সেই বিভীষিকা তাঁর মনে ফিরে আসতো- জানামতে জীবনে কখনই উনি এর থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাননি। কী করুণ কষ্টের জীবন!

বিস্ময়ের ব্যাপার এই ধরনের একটা অভিজ্ঞতা ও অসুস্থতা নিয়েও তিনি কার্টুন এঁকেছেন, ক্রিয়েটিভ কাজ করেছেন। র'নবী স্যারের শিষ্য হিসেবে সাপ্তাহিক বিচিত্রায়, এরপরে কার্টুন পত্রিকা এবং আমাদের উন্মাদে তো এই সেদিন পর্যন্তও এঁকে গেছেন। দৈনন্দিন চাকুরী ছিলো পরিবেশ নিয়ে আন্দোলনরত 'বেলা' তে। বেশ কয়েকবার বেলাতে তাঁর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। শান্ত সৌম্য চেহারায় বসে বসে আঁকছেন। বেলার সবাই তাঁকে বেশ সম্মানও করতো। এই ঘটনাটা পুরোটাই তাঁর মুখ থেকে সরাসরি শোনার সৌভাগ্য হল ২০১২ সালে। তখন বাংলাদেশ কার্টুনিস্ট এসোসিয়েশন গঠনের কাজ করছি, তার প্রথম বড়সর প্রদর্শনীর আয়োজন করে দিচ্ছে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট শোরগোল। শোরগোলের শাতিল আর আমি মিলে এক ভিডিও ক্যামেরা নিয়ে বেলার অফিসে উপস্থিত হলাম সেদিনই এই অবিশ্বাস্য ঘটনাটা শুনেছিলাম। সেবার আমরা আমাদের এসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে এই গুণী মানুষটিকে আজীবন সম্মাননা পুরস্কারে ভূষিত করি। এবং তার পর থেকে উনি আবার বিপুল উদ্যমে উন্মাদ পত্রিকায় কার্টুন আঁকা শুরু করেছিলেন।

নজরুল ভাই চলে গেলেন, মৃত্যুর বিভীষিকা মস্তিষ্কে পুরে এতগুলো বছর যিনি সেই '৭১ এর ভয়াল দিনকে নিয়ে ঘুরছিলেন, তিনি আজ মুক্তি পেলেন, আশা করি আর আপনার সেই ভয়ানক কষ্টটা পেতে হবে না, ভালো থাকুন নজরুল ভাই, ভাল থাকুন আপনি। 

2 comments:

  1. খুব ভালো লিখেছো মেহেদী। নজরুলভাই-এর সেই ভিডিও সাক্ষাতকারটা কি তোমার কাছে আছে?

    ReplyDelete
    Replies
    1. না... ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট টিম 'হারিয়ে ফেলেছে' এবং সেখানে শান্ত ভাই সহ আরো অনেক কার্টুনিস্টেরই সাক্ষাতকার ছিল।

      Delete

IBRAHIM Bangladeshi superhero comics character suit design

ঢাকা কমিকসের সুপারহিরো কমিক্স ইব্রাহীম সিরিজের জন্যে আমরা একটা সুপারহিরো স্যুট ডিজাইন প্রতিযোগিতা ডেকেছিলাম, দারুণ দারুণ সব কাজ জমা পড়েছে সে...