May 11, 2020

বিদায় সাজ্জাদ ভাই

একটা আশংকা অনেকদিন থেকেই আমরা সবাই বয়ে বেড়াচ্ছিলাম, এই বুঝি আপনি 'আর নেই' হয়ে গেলেন, 'ক্যান্সার' শব্দটা ধক করে এসে বুকে লেগে যায়। তবে সেই অবস্থায় যতবারই আপনাকে দেখেছি মনে হয়েছে ক্যান্সার ব্যাপারটা অত ভয়ানক নয়, অন্তত আপনার সাথে সে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। কতদিন চিনি আপনাকে? বিশ বছর? বাইশ বছর? এর মধ্যে কখনো হাসিমুখ ছাড়া দেখেছি? মনে পড়ে না। এমনকি এই ভয়ানক রোগের মধ্যেও কি অনায়াস আকর্ণলম্বিত মন ভোলানো হাসিটা তো আপনার লেগেই ছিলো মুখ। সহসা এরকম উত্তম কুমার ঘরানার ভদ্রলোক আমি দেখিনি। যেন ষাটের দশকের পর্দা কাঁপানো কোন বাংলা ছবির নায়ক এখন প্রৌঢ় বয়সে হঠাৎ ঘুরতে এসেছেন আমাদের উন্মাদ অফিসে।  

আপনাকে নিয়ে কোত্থেকে কিভাবে লিখব তা ভেবে বের করা মুশকিল। অল্প স্বল্প চেনাদের নিয়ে লেখা সহজ, কারণ তাদের নিয়ে স্মৃতি খুব বেশী থাকে না। একটা যেটা প্রথমেই মনে পড়ে সেটা বলি। একটা কিশোর উপন্যাস লিখেছেন- অরুণ আমার মামাতো ভাই, সেটার ইলাস্ট্রেশন করবো কিনা জানতে চাইলেন। সাথে সাথে রাজী হই, কারণ বড় বইয়ের ইলাস্ট্রেশন ওটাই আমার প্রথম। সেটা কিভাবে আঁকবো সেই প্রসঙ্গে একটা ছোট কথা বললেন সেটা এখনো আমার মনে আছে। হয়ত আপনার মনে নেই, কাজী আবুল কাশেমের (কার্টুনিস্ট দোপেঁয়াজা) একটা ইলাস্ট্রেশন দেখালেন, ঝড়ের কবলে পড়া এক নৌকা। বললেন-
কিছু মনে না করলে বলি, তোমাদের এখনকার ড্রয়িং এ অনেক কসরৎ থাকে, অনেক ডিটেইল আর স্কিল। কিন্তু এটা দেখো। এই যে কয়েকটা টানে ঝড়ের তীব্রতার যে আবহ সেটা কি দূর্দান্ত এসেছে। একজন ভাল শিল্পী কিন্তু এটাই করেন। স্কিলের চাইতে মুড আনেন আরো জোরালো করে। 
পুরো এক মাস ধরে একটা বড় খাতায় ড্রাফটিং পেন দিয়ে ধীরে ধীরে এঁকেছিলাম সেই বইটা। এর পর তো আপনার আরো কত বইয়ের কাজই করেছি। সেই সাথে আপনার দারুণ লেখনির সাথেও পরিচয় হয়েছে। কিন্তু কখনই সেই কথাটা ভুলিনি। মাঝে মাঝে আপনার আরামবাগের প্রেসে যাওয়া হত। কাগজ কাগজ গন্ধওয়ালা গলি তস্য গলি পার হয়ে অফিসে গেলেই জুটতো চা, আর উপরি হিসেবে মাঝে মাঝে আপনার অনুজ আসরার ভাই সহ একটা জমাট আড্ডা।

একবার দেখা হয়েছিলো পল্টনের হারূন এন্টারপ্রাইজের সামনে, আমি কিনিতে গিয়েছিলাম পয়েন্ট  থ্রি লাইনার। রিক্সা থামিয়ে নেমে এলেন। শহরে এসব বিরল। গ্রিন রোডে বাসা নেবার পর শেষের ক'দিন মাঝে মাঝেই জ্বালাতন করতে যেতাম বাসায়, জানি অসুস্থ, কিন্তু এত কাছে থেকেও দেখা না করার মানে নেই। 

প্রথম আলো পত্রিকায় নিতান্তই অকিঞ্চিতকর একটা ছোট গল্প বের হলো আমার, সাথে সাথে প্রথম এস এম এস আপনার থেকে-
নতুন জগতে স্বাগতম, গল্পটা ভালো লেগেছে।

সাজ্জাদ ভাই, আমি সবচেয়ে অবাক হয়েছি আপনার মানসিক জোর দেখে। গড় আয়ু পেলে বছর বিশেক পরে আমি মারা যেতে পারি এটা ভেবে আমার মাঝে মাঝে মাঝরাতে ঘুম চটে যায়। সেখানে আপনি মৃত্যুর এত কাছে থেকেও এত সাবলীল আর প্রডাক্টিভ থাকলেন কিভাবে? শেষবার যখন বাসায় গেলাম, এই মেলাতেও দেখি দুটো বই বের হয়েছে। এবারে আমাকে বলেন নি বলে একটু সলজ্জ হাসি দিলেন, বললেন-
তুমি তো এখন ব্যাস্ত তাই...
তা বটে, ব্যস্ত তো বটেই, তবে আপনি বললেই আমি যেভাবেই হোক সেটা করে দিতাম।  যদিও তা আর বলা হয় নি। বাসা থেকে বের হবার সময় মনে হল এবার আস্তে আস্তে সেড়ে উঠবেন আপনি। ক্যান্সারকে যিনি জয় করতে পারেন তাঁর আর কোন কিছুতেই ভয় নেই।  কিন্তু সেটা আর হলো না।

মানুষ মরে গেলে স্মৃতি হয়ে যায়। আপনি আমাদের স্মৃতি হয়ে রইলেন।

ভাল থাকুন সাজ্জাদ ভাই।
আপনাকে নিয়ে লেখাটা কেমন অসংলগ্ন হয়ে রইলো/

4 comments:

  1. এই মানুষটাকে নিয়ে লেখা সংলগ্ন হবার কথা না,মেহেদি।

    ReplyDelete
  2. চমৎকার লিখেছো মেহেদী। আমার দেখ হাতই চলছে না.....

    ReplyDelete
  3. হ্যাঁ তাপস ভাই...।

    ReplyDelete

বিদায় ব্লগস্পট

গুণে গুণে ১২ বছর এখানে কাটালাম, এবং হঠাৎ সেদিন হঠাৎ আবিষ্কার কুরলাম আমি ছাড়া আর কেউই নেই আশেপাশে। খোঁজ নিয়ে দেখতে পাচ্ছি এখন আর্টিস্টরা সবাই...