December 07, 2017

অনলাইন ড্রয়িং কোর্স: CGMA

ইদানীং ড্রয়িং এর অবস্থা যা-তা। এনাটমি, কালার লাইট শেড, এনভায়রনমেন্ট সবই আঁকতে বেশ কষ্ট হচ্ছে, কারণ আঁকার সময় খেয়াল করি সেই গত কয়েক বছর এই একই জিনিস এঁকে যাচ্ছি, শিখছি না। একটা লেভেল আপের দরকার অনেক দিন থেকেই। সবচেয়ে বিপদ হয় কমিক্সের ক্যারেক্টার করতে। এক ক্যারেক্টার একেক ফ্রেমে একেকরকম হয়। ওদিকে ইউটিউবে টিউটোরিয়াল দেখে শেখার সমস্যা হল একেক জন একেক ভাবে বলছে, আর সেটা দেখে দেখে করলে সেটার ফিডব্যাক তো আর পাচ্ছি না। তাই জীবনে প্রথম একটা অনলাইন আর্ট কোর্স করলাম। FUNDAMENTALS OF CHARACTER DESIGN with আহমেদ আলদুরিব্রেট বিন (এই দুইজনের কাজ অবশ্যই দেখবেন সবাই) under CGMA  ।
জীবন শেষ করে দিলো ব্যাটারা, আঁকতে আঁকতে হাত ব্যাথা, একেবারে সেই গোড়া থেকে আবার সব শুরু, জেশ্চার, সিলিন্ডার, ফর্ম, রেফারেন্স ফটো স্টাডি। সব শেষে যে কোন একটা থিম ঠেকে একটা পূর্ণ ক্যারেক্টার তার গল্প সহ তোইরী করা। আমি আমাদের আদিবাসী থিমের সাথে সাই-ফাই মিলিয়ে একটা ক্যরেক্টার করেছি শেষে।
কোর্স করে মহা আর্টিস্ট হয়ে গেছি তা না, কিন্তু কি কী সমস্যা আছে সেটা জেনেছি। এটাই একটা বিরাট মোটিভেশন। আশা করি আঁকা নিয়ে আরো সিরিয়াস হব এখন থেকে।
বিঃদ্রঃ ইহা হয় একটি দামী কোর্স, সিনটিক কেনার জন্যে যেই টাকাটা স্পন্সর পেয়েছিলাম কার্টুনিস্ট মিতুর থেকে, দিন শেষে দু'জনেরই মনে হল সেটা দিয়ে একটা গেজেট না কিনে বরং কিছু শিখি। আশা করি বেটার ইনভেস্ট ছিলো।

















December 04, 2017

টেক্সট বই প্রিন্ট আপডেট

জীবনের এ পর্যন্ত সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্ট শেষের পথে। পৃন্ট মিডিয়ার কাজ যতই ভাল হোক সব পৃন্ট হাতে না আসা পর্যন্ত আতংক গলার কাছে আটকে থাকে। কখন কোথায় কী ঘটে যায় বলা যায় না। যেমন এবারেই টেক্সট বইয়ের পৃন্ট ভার্সন করার আগে যা হল তা নিয়ে 'ছাপাখানার ভুত ভুতং ভুতৌ ও অন্যান্য' নামে একটা বই লিখে ফেলা যাবে। পৃন্ট শুরু হবা এক সপ্তাহ আগে কি মনে করে সব পেইজ খুলে চেক দিচ্ছিলাম। হাজার ফাজার পৃষ্ঠা একটা একটা করে ইপিএস ফরম্যাট দেখার একমাত্র সহজ উপায় হল এডোবি ব্রিজ এ থাম্ব ভিউ দিয়ে জুম করে দেখা। তাতে যা যা ধরা পড়ল তা দেখে আক্কেল গুড়ুম সবার। এডোবির অতি স্মার্ট ইপিএস এক্সপোর্ট পদ্ধতি যত ধরনের ফর্মুলা আছে সব পালটে আরেকটা ফন্ট করে দিয়েছিলো। অতঃপর এনসিটিবির অফিসে গিয়ে মূল গ্রাফিক অপারেটরের সাথে বসে পুরো টিম মিলে বলতে গেলে আবার সব ধরে ধরে সব পৃষ্ঠা ঠিক করতে হয়েছে, কষ্টের কাজটা এনসিটিবির টিমই করেছে শেষে। সব ঠিক করার পরেও মনের মধ্যে এবার ভয় ঢুকে গেল। বিকট সব স্বপ্ন দেখা শুরু হল আমার আর মিতুর।
আমি দেখলাম, স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা, আমার বায়োলজি স্যার প্রশ্ন দিতে দিতে হাসিমুখে বললেন-

- 'সব কিন্তু এজ ইটিজ আঁকবি। আর মনে রাখবি, সব রঙ করতে হবে।' 
- 'রঙ করার টাইম হবে না স্যার' আমি আতঙ্কে বললাম।
- 'টেক্সট বই আঁকার সময় খেয়াল ছিলো না? হাহাহাহা' (কুৎসিত হাসি)

আমার সবচেয়ে প্রিয় বায়োলজি স্যারের এইরকম শত্রুতা দেখে জেগে উঠে পরদিন আবার মিতু দেখলো ফিজিক্স বইয়ের সব ফন্ট সফটওয়ারের কারণে চাইনিজ ফন্ট হয়ে গেছে। এবং বাংলাদেশের সব পত্রিকায় এ বিষয়ে চীনের শি জিন পিং আনন্দ বার্তা জানিয়েছেন।

এইসব কারণে আমরা মুখ শুখনা করে ঘোরা শুরু করলাম। মিডিয়ার কল্যাণে আর নিজে পণ্ডিতি করে ব্লগে লিখে দুনিয়ার সবাইকে জানিয়ে দিয়েছি আমরা এই প্রজেক্টে আছি, তাই পরে পালানোরু উপায় নেই। হঠাত একদিন স্যারের ফোনে জানলাম পৃন্ট শুরু হচ্ছে। শুনে রীতিমত প্রেশার হাই হয়ে গেল আমাদের। এবং কিছুদিন পর আবার একদিন স্যারের কল আসলো। এনসিটিবি থেকে তাঁকে দাওয়াত করা হয়েছে কিভাবে পৃন্ট হচ্ছে তা দেখতে। আমরা যেতে চাই কি না। অবশ্যই চাই। এক শুক্রবার সকালে এনসিটিবির কর্মকর্তা রতন সিদ্দিকী তাঁর বিরাট গাড়ি নিয়ে এলেন স্যারের বাসায়। রওনা হলাম, স্যার, ইয়াসমীন ম্যাডাম, স্যারের মেয়ে ইয়েশিম আর আমি-মিতু। প্রেস নাকি সব মাতুয়াইলে! এত দূরে যেতে হবে আগে বুঝিনি। কিন্তু বড় বড় সব প্রেস নাকি সব ওখানেই। বিশেষ করে এনসিটিবির পৃন্ট ওখানেই হয়। পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ প্রিন্টিং। ৩৫ কোটি বই প্রতি বছর! স্যারের এনালাইসিস সব বই পর পর রাখলে পুরো পৃথিবী ৬ বার প্রদক্ষিণ করতে পারবে। এটা একটা বিশ্ব রেকর্ড, প্রজেক্টটা করার আগে আমার কোন ধারনা ছিলো না। এবং মাতুয়াইলে গিয়ে প্রেস দেখে আমি আর মিতু একসাথে বললাম- 'বাপরে!' 

গলি তস্য গলি পাড় হয়ে যেই প্রেসেই ঢুকি সেখানে এলাহী কাণ্ড। মেশিনের পর মেশিনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একের পর এক বই বের হচ্ছে। এখানে বড় বড় শিট হাতে ভাঁজ করে ফর্মা (সবচেয়ে বড় যে শিটে একসাথে ছাপা হতে পারে, পরে এটাকে ভাঁজ দিয়ে বা কেটে বইয়ের মাপে আনা হয়) করা লাগে না। মেশিনই ফর্মা ভাঁজ করে দেয়। আর পৃন্ট থেকে বাইন্ড পর্যন্ত ধরে একটা প্রেস দিনে বই ছাপতে পারে এক লক্ষ! আমার আগে ধারনা ছিলো শুধু চায়নাতেই এটা করা যায়। এবারে জানলাম আমাদের পৃন্টিং কত দ্রুত আরো কত পেশাদারি জায়গায় চলে যাচ্ছে। আর পৃন্ট? আমার আগের দেখা যে কোন টেক্সট বইয়ের চে' কাগজ ভালো, পৃন্ট কোয়ালিটিও দারুণ। দুই এক জায়গায় টুকটাক কারিগরি সমস্যা যে হচ্ছে না তা না। তবে এখন থেকে আর আমরা দুঃস্বপ্ন দেখবো না আর এটা নিশ্চিত। লেখা আর না বাড়িয়ে ছবিতে আর ভিডিওতে বাকিটা শেষ করা যাক।


পদার্থবিজ্ঞান আর জীববিজ্ঞানের ফুল শিট প্রচ্ছদ সহ আমি, প্রেস মালিক (নাম মনে নেই :/) ইয়াসমীন ম্যাডাম, স্যার, মিতু

ঝকঝকে রসায়ন বই।

সরেজমিনে পৃন্টিং দেখতে স্যার একটা মেশিনের পাটাতনে, বাঁয়ে প্রেসের ম্যানেজার (নাম মনে নেই :/) ডানে রতন সিদ্দিকী সাহেব।

(নাম মনে নেই -ম্যানেজার) স্যার, ম্যাডাম, আর স্যারের মেয়ে ইয়েশিম।  

জীববিজ্ঞান (জেনারেল লাইন)

জীববিজ্ঞান (মাদ্রাসা লাইন)

সরেজমিন


প্রিন্টিং প্রক্রিয়া



বাঁধাই চলছে





November 01, 2017

পুরানো কাজ

সেন্ট মেইলবক্স খালি করতে গিয়ে খুঁজে পেলাম, ২০০৯ সালের আঁকা। ব্র্যাকের জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অফ পাবলিক হেলথের বার্ষিক প্রতিবেদনে ইউপিএলের মাহরুখ আপুর জন্যে করা। বেশ মজা পেয়েছিলাম কাজগুলি করতে। আজকাল আর নিব পেনে আঁকা আর মাউসে রঙ করা কাজ খুঁজে পাই না। এগুলি পেয়ে মজা পেলাম তাই।
ছোটখাটো অসুখে ডাক্তারদের ধরিয়ে দেয়া প্রেসক্রিপশন।

মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভরা যেভাবে ডাক্তারদের নিয়ন্ত্রণ করে। এটা শুধু আমাদের দেশে না,
খোদ আমেরিকার চিত্র দেখতে চাইলে কেউ মাইকেল মুরের 'Sicko' ডকুমেন্টারিটা দেখে নিতে পারেন।

সিটীজেন চার্টারের 'দুরাবস্থা' 'আ' কার দেখেই বোঝা যাচ্ছে।

October 31, 2017

মথ-ক্যারেক্টার

সিঁড়ির গোড়ায় একটা মথ মরে পড়ে ছিলো, আগে স্টাডি করা হয়নি কখনো, নিয়ে এসে টুকটাক স্কেচ করলাম, কালারটা প্রায় এনালোগাস, সেটা থেকে একটা ক্লিশে টাইপ ক্যারেক্টার আঁকলাম। ক্লিপ স্টুডিওর ব্রাশের মিক্সড গ্রাউন্ড কালার অপশনটা ভাল লাগলো বেশ।


October 30, 2017

চতুর্ভূজ-ত্রিভূজ পদ্ধতি

যে কোন জটিল ফর্মকে প্রথমে বড় কোন বেসিক ফর্মে আটকে নিলে পরে আঁকা সহজ হয়। যত জটিলই হোক না কেন যে কোন জটিল ফর্ম আসলে অসংখ্য ছোট ফর্ম দিয়েই তৈরি হয়। আর এভাবে সহজ বড় ফর্মে আগে আটকে নিলে এর পর ধীরে ধীরে অন্য ছোট ফর্ম যোগ করলে আরেকটা ভাল ব্যাপার ঘটে, সেটা হল- স্টাইল। সরাসরি রিয়েলিস্টিক ছবি থেকে এভাবে আঁকা প্র্যাকটিস করলে নিজে নিজেই একটা মজার স্টাইল তৈরী হতে থাকে। উদাহরণ দেয়া যাক।


দেখতে মোটামুটি জটিল এই গাছকে চাইলে এভাবে একটা চতুর্ভূজে আটকে নেয়া যায়, চাইলে একটা বৃত্তেও আটকানো যেত। কিন্তু এটা সবদিকে সমান টাইপ না, বরং এভাবে আঁকাবাকা চতুর্ভূজে আটকালে পরে ডিটেইল করা সহজ হতে পারে। এই কাজটা কিন্তু সহজ না। গাছটার দিকে তাকিয়ে একটা ফর্মে ভাবা আসলে প্র্যাকটিসের ব্যাপার। দেখার চোখ তৈরী করা আঁকার চাইতে জরুরী। গাছটার কান্ড একটা উলটা ভি সাইন দিয়ে আপাতত করে রাখা হল।
এবারে খুব গুরুত্বপূর্ণ আরেকটা কাজ। আসলে আমরা যেহেতু একটু ডিটেইলে যেতে চাচ্ছি- সে ক্ষেত্রে চতুর্ভূজের ওপরে এভাবে কিছু ত্রিভূজ দিয়ে ভরাট আর ফাঁকা জায়গাগুলি আটকাই। মানে কোথাও কোথাও কিছু পাতা চতুর্ভূজের মূল ফর্মেরর বাইরে চলে গেছে, সেগুলিতে বাইরে ত্রিভূজ, আর যেসব জায়গায় ভেতরে আসলে কোন পাতা নেই, খালি জায়গা সেগুলি ভেতরে ত্রিভূজ এঁকে আটকানো হল।

এবারে পাতা টাতা ইচ্ছামতন আঁকা হলে জিনিসটা দাঁড়াবে এরকম। খেয়াল করার আছে একেবারে ত্রিভূজ বা চতুর্ভূজের মধ্যেই কিন্তু পাতা আঁকা থেমে থাকেনি, বেশ কিছু জায়গায় বাইরে গেছে। তবে সেটা মূল গাইডলাইনটাকে মেনেই।

শেষমেশ জিনিসটা দাঁড়ালো এমন। এমনিতে গাছটা দেখে দেখে এটা আঁকা সহজ ছিলো না। কিন্তু এই ত্রিভূজ-চতুর্ভূজ নিয়মে দেখতে দেখতে বেশ দেখনসই একটা স্টাইলাইজড গাছ এঁকে ফেলা গেল। চ্যালেঞ্জ নিতে চাইলে তিন ধরনের আরো তিনটা গাছ এঁকে এখানে পোস্ট করুন।





October 23, 2017

Demon challenge

ফেইসবুকের দুর্দান্ত গ্রুপ Character Design Challenge প্রতি মাসে নতুন ক্যারেক্টার ডিজাইন প্রতিযোগিতা ছাড়ে। কত মহা মহা আঁকিয়ে যে এখানে কাজ দেয়! অসামান্য সব কাজ খালি মুগ্ধ হয়ে দেখি। এবারে ছিলো ডেমন- মানে শয়তান। ক'দিন আগেই নেপাল ঘুরে এলাম সে সময় হিন্দু ও বৌদ্ধ ডেমনোলজির দুটো ছোট বই কিনেছিলাম, Ritual objects and Deities: An iconography on Buddhism and Hinduism (এটা অবশ্য মিতু কিনেছে). আরেকটা স্রেফ-Himalayan Folklore: Ghosts and Demons from West NEPAL (এটা আমি)। এই জিনিস নিয়ে পড়তে গিয়ে দেখি হিন্দুইজম বা বুঢিজম এ কোন পরম শয়তান বলে কিছু নেই। সেমিটিক ধর্মগুলিতে যেমন একদিকে ইশ্বর আরেকদিকে শয়তান এখানে ব্যাপারটা তা না। আমি এদ্দিন শয়তানের মুখোশ বলে যা সব দেখে এসেছি যেমন কালভৈরব, বজ্রকিলা, বজ্রপানি, বা যে কোন 'লাখে' এগুলো আসলে উলটো ভাল জিনিস। মানে এরা বরং অশুভকে বিতারণে ব্যস্ত। যাই হোক মাঝখান থেকে বেশ কিছু মাস্ক আর সেই ইলাস্ট্রেটেড বইয়ের কিছু মোটিফ স্টাডি করেছিলাম, সেগুলি মিলিয়ে ঝিলিয়ে সেই গ্রুপেও দিলাম। সাথে সাথে সেটা শ'খানে অসামান্য কাজের আড়ালে কই চলে গেল। 

এঁকে দারুণ মজা পেয়েছি। ভাবলাম ব্লগে তুলে রাখি এইবেলা।


বিমূর্ত শিল্পকলা ও আমাদের সংকট


শিল্পাচার্জ জয়নুল আবেদীনের দুর্ভিক্ষ সিরিজ থেকে। ছবির সোর্স

শিল্পী কেন শিল্প তৈরী করেন? এর আসলে কোন সহজ উত্তর নেই। সহজ উত্তর হল- তার ইচ্ছে করে তাই, তার ভালো লাগে তাই, অথবা তার খারাপ লাগে তাই। সোজা কথা কোন তীব্র আবেগ মানুষ নিজে নিজে ধারন করতে পারে না। তার কাউকে বলতে হয়। কাউকে জানাতে হয়। একটা সুন্দর বসন্তবৌরী পাখি প্রথমবারের মত কেউ দেখলে আগে নিজে অভিভূত হবে আর তারপরেই সে চাইবে আশেপাশে আর কাউকে দেখাতে। শিশু যেমন অদ্ভুত কিছু দেখলে সাথে সাথে সেটা আঙ্গুল দিয়ে কাউকে দেখাতে চায়, সেই একই কারণে। এটা অন্যের কাছে আরো উপাদেয় করে তুলতে পারে শিল্পী। শিল্পী মানে কিন্তু আঁকিয়ে বলা হচ্ছে না শুধু। চিত্রকলা, কলাবিদ্যার একটা মাধ্যম মাত্র। সব মাধ্যমেই কথা একই। মূল ব্যাপারটা হল- আমি যেটা দেখেছি বা ভেবেছি সেটার গল্পটা অন্যকে বলা। সেটা গানে, কবিতায়, নাটকে, সিনেমায় যেভাবে হোক বলা চাই।

এবারে ঠিক পরের কথাটাই হল এই বলাটা কে কাকে বলতে চাইছে?  শিল্পী যাকে বলতে চাইছে সে যদি ব্যাপারটা না-ই বোঝে তবে তা বলার মানে থাকে না। ধরা যাক আমি খুব দারুণ একটা চীনা গল্প পড়েছি। আমি চাচ্ছি অন্যেরাও সেটা শুনুক। আমি গল্পটা চাইনিজ ভাষাতেই পড়েছি কারণ আমি চাইনিজ জানি। এখন যেহেতু গল্পটা চাইনিজ আমি সেটা চাইনিজ ভাষাতেই আমার সব বন্ধুদের বললাম। ফলে যেটা হবে সব বন্ধুরা জানবে যে আমি চাইনিজ ভাষা জানি কিন্তু গল্পটা তারা বুঝবে না। তাদেরকে আমার আসলেই সেটা বোঝাতে হলে বলতে হবে তাদের ভাষায়। 

শিল্পের ক্ষেত্রে বিমূর্ত ভাবধারা একটা দারুণ উৎকর্ষ সন্দেহ নেই, কিন্তু যদি কেউ আশা করে সেটা সর্বসাধারণের বোঝা উচিত তবে আমার মতে সেটা এই বন্ধুদের চাইনিজ গল্প বলার মত ঘটনা। যাকে বলছি তার ভাষায় যদি বলা না যায় তবে বলার মানে নেই। তাই শিল্পীকে বলার আগে প্রথমে ভাবতে হবে এটা আমি কাকে বলছি? সবাইকে বলার কিন্তু দরকার নেই, হতে পারে চাইনিজ গল্পটা আমি যারা চীনা ভাষা জানে খালি তাদেরই বলছি। কিন্তু সেটা আগে নিজের কাছে নিজের পরিষ্কার থাকা দরকার। সবাই কেন চাইনিজ বোঝে না সেটা ভেবে সবাই যে আসলে অশিক্ষিত এবং আমি যে এদের থেকে আলাদা এটা বলাটা কতটা হাস্যকর তা আশা করি এই উদাহরণ থেকে বোঝা যাচ্ছে। 

আমার কাছে মনে হয় আমাদের শিল্পকলায় এরকম দুই মেরু তৈরী হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। একটি অতি বিমুর্ত, অন্যটি অতি খেলো। খেলো শিল্প বলতে আমি সেইসব কাজের কথাই বলব যা আসলে শিল্পের তাড়নায় হয় না, হয় শুধুমাত্র অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে। রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে উঠতে। বিমূর্ত চিত্রকলা বা শিল্প থাকাটা জরুরী, আর খেলো লাফালাফিও সমাজ থেকে নাই হয়ে যাবে না, সেটা বরং সাময়িক গণ মানুষের কাছে জনপ্রিয়তাও পাবে। কিন্তু এসব বাদ দিয়ে আরেকটা অতি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা খালি হয়ে যাচ্ছে সেটা হল- মধ্যপন্থার শিল্প, মানে যা বিমূর্তও না, অকারণে জনপ্রিয় হবার লাফালাফিও না, সেটার ব্যাপক অভাব দেখা যাচ্ছে।  শুধু চিত্রকলা নিয়েই যদি বলি কতিপয় ব্যাতিক্রম ছাড়া আমাদের অসম্ভব গুণী শিল্পীরা কিন্তু চাইনিজ গল্পই বলে যাচ্ছেন, আমরা বুঝতে পারছি না। ইউরোপীয় ভাববাদ ও বিভিন্ন ইজম তাঁরা মধ্যপন্থার বাংলায় ব্যাখ্যা করতে পারছেন না। আমাদের নিজেদের ইজম গড়ে উঠছে না, আমরা দুর্বল অনুবাদেই আটকে আছি। একই সাথে চিত্রকলায় পপুলার ধারা শীর্ণ হয়ে আসছে। সমসাময়িক সমাজ, রাজনীতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে শিল্পীরা কাজ করছেন না তা নয়, কিন্তু সেটা কেন জানি সুখপাঠ্য হচ্ছে না। দুর্বোধ্য সংকেতের মারপ্যাঁচে তা তাদের নিজেদের বৈঠকখানার চায়ের কাপেই আটকে যাচ্ছেন, মডার্নিজম পার হয়ে পোস্ট মডার্নিজম চলে যাচ্ছে, আমরা আমজনতা যেই তিমিরে সেই তিমিরেই রয়ে যাচ্ছি। একটা বড় শিল্পীগোষ্ঠী ইউরোপমুখী যশাক্রান্ত বিধায় দেশের মানুষদের মূর্খ ভাবছেন। কিন্তু বাস্তবতা হল প্রতিটা দেশই আলাদা, তার নিজস্ব একটা ইতিহাস থাকে, থাকে নিজস্ব দৃশ্য-ভাষা। সবাই চেনে ও জানে এমন ভাষায় না বলে আমি বাইরের ভাষায় বলে আশা করতে পারি না সবাই বুঝবে, এবং ইউরোপীয় দর্শন জানি না বলে আমি ততটা মূর্খ না যতটা সেই শিল্পী তার নিজের দেশের দর্শন না জেনে হচ্ছেন। 

এখন এ তো গেল সংকটের কথা, সমাধান কী? সমাধান এক কথায় বলা সহজ না, তবে যে কারণে এই লেখার অবতারণা সেটা হল- এই মুহূর্তে অসম্ভব প্রতিভাবান আঁকিয়ে ও শিল্পীর দারুণ একটা জাগরণ ঘটছে আমাদের দেশে। তাঁরা আঁকছেন, গাইছেন, শিল্প সৃষ্টি করছেন। তাঁরা তাঁদের উচ্চমার্গীয় বোধে আঁকুন সমস্যা নেই কিন্তু আমাদের নিজেদের ভাষার আঁকিয়েও খুব দরকার। যার গল্পটা বাংলায় বলা, যার গল্প বলে আসলেই কিছু আছে। শুধু আমি কতটা ভাল কাজ করি এটা দেখানোই উদ্দেশ্য না। আমার একটা গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যও থাকতে হবে সাথে। যা সবাইকে ভাবাবে ও একটা জীবনদর্শন দেবে। 'জনমানুষের জন্যে শিল্পই একমাত্র সার্থক শিল্প' এমন না হলেও জনমানুষের শিল্প সবচেয়ে প্রয়োজনীয় শিল্প বটেই। 

তাই শিল্পীদের আঁকা উচিত প্রথমে নিজেদের জন্যে তারপরেই নিজেদের আশাপাশের সবার জন্য। যাকে পাশে তাকালেই দেখা যায়। যাকে আঙ্গুল উঁচিয়ে দূরের বসন্তবৌরী দেখিয়ে বলা যায়। ইউরোপের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করলে সেটা অতদূরে না-ও পৌঁছাতে পারে। আর কোনভাবে পৌঁছালে দেখা যেতে পারে এরকম পাখি তারা ১০০ বছর আগেই ঢের দেখেছে। তাই পা নিজের মাটিতে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ।

জাপান টাউনে

 মিতু আর অনু ছাড়া আজ ১১ দিন। ইন ফ্যাক্ট একেবারে একা বিদেশে পড়ে আছি সেটাও এই প্রথমবার। কমিকস এর মাস্টার্স প্রায় শেষ পর্যায়ে। ক্যালিফোর্নিয়া ক...