December 11, 2014

আমাদের অসীম চন্দ্র


আমার ক্যারিকেচার হাতে ক্যারিকেচারিস্ট অসীম চন্দ্র রায় (চারুকলায় চান্স না পাওয়া)
অসীমের সাথে আমার প্রথম দেখা বছর চারেক আগে, ঢাকার রমনা চাইনিজে টিআইবি'র (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ) কার্টুন কর্মশালায়। সেবার সব কার্টুনিস্টদের ডাকা হয়েছিল ঐ আয়োজনে। যদ্দুর মনে পরে অসীম 'ক' গ্রুপ এ কাজ দিয়েছিল। কাঁচা হাতের কাজ, তবে এভারেজের চে' ভাল। যাই হোক ওই পর্যন্তই, এর পর বছরখানেক পর তার একটা ফেইসবুক পেইজ দেখলাম, Artist Asim's Creation একটু ছেলেমানুষী মনে হল সেটা। যাই হোক পরে জানলাম ছেলেটা পঞ্চগড় থাকে। আর বাংলাদেশের যেই কমন সমস্যা সেটা এখানেও আছে। ঢাকার বাইরে থাকলেই একটা ব্যাপার মনে হওয়াটা স্বাভাবিক যে অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। আসলেও ব্যাপারটা তাই। একটা দেশের রাজধানীর সাথে দেশের বাকী শহরগুলির সুযোগ সুবিধার এত প্রকট পার্থক্য পৃথিবীতে আর কোথায় আছে আমার জানা নেই। তো সেই কারণে অসীম নিজেও এই কমপ্লেক্স এর বাইরে ছিলো না। খুব স্বাভাবিকভাবেই তার মনে হতে লাগলো সে অনেক কিছু থেকে বঞ্ছিত। যাই হোক আমি তার পেইজ ফলো করি। আর সেই সাথে ফলো করি যে সে যথেষ্ট ট্যালেন্টেড পোর্ট্রেইট আর্টিস্ট। আর একেবারে বর্ডার এরিয়ায় অন্য সব কিছু থেকে দূরে থাকায় তার যেটা শাপে বর হচ্ছে সেটা হল সে নিজের মত করে শিখতে বাধ্য হচ্ছে। বড় বড় আর্ট পেপারে আশে পাশের সবার ক্যারিকেচার করে দিচ্ছে সে। ডিজিটাল ব্যাপারটা কী সেটা সে সেভাবে জানেই না, ফলে আঁকিয়েদের মূল রসদ যে হাতে কলমে ড্রয়িং সেটা তার ভালই জমা পড়ছে। ধীরে ধীরে দেখা গেলো তার ড্রয়িং অনেক ম্যাচিউরড হচ্ছে। বিশেষ করে চেহারার ফিচারগুলির ত্রিমাত্রিক গঠন সে বশ ভালভাবে রপ্ত করছে। যদিও যা আঁকছে তা অনেক ক্ষেত্রেই ক্যারিকেচার হচ্ছে না। ধীরে ধীরে সে প্যাস্টেল ঘষে তার জাম্বো সাইজ ক্যারিকেচারগুলিতে রঙ চড়ানো শুরু করলো। আস্তে আস্তে তার আঁকা আরো অনেক ভাল হতে লাগলো। যদিও Artist Asim's Creation কথাটা তখনো টিনেজ ছেলেমানুষী টাইপই মনে হল। আর আমি মনে মনে ভাবলাম ফেইম এর গাড্ডায় পড়লে শেখার আগেই এই ছেলেটা শেষ না হয়ে যায়। স্যোশাল মিডিয়ার এই যুগে প্রত্যেকেই নিজের চৌহদ্দিতে একেকটি সেলিব্রেটি বিশেষ। যাইহোক এই সময় সে ইন্টার পাশ করল। এবার সে চারুকলায় ভর্তি হবে (নো ওয়ান্ডার)। ঢাকায় এসে শুরু হল পৃপারেশন। তখন আরেকবার দেখা হয়েছিল মনে পড়ে, কথা বলে কিন্তু মনে হল আমার ধারনা কিছুট সত্যি। সে ওভার কনফিডেন্ট চারুকলায় চান্স পাবার ব্যাপারে। মানে সব কথাই চান্স পাবার পরে কী করবে সেটার ওপর। আমি যেহেতু ফাইন আর্টস এর না সুতরাং যেচে কোন উপদেশ দিলাম না। যথারীতি পরীক্ষা হল। রেজাল্ট হল এবং অসীম ফোন দিয়ে বল্ল- দাদা চান্স পাই নি। আমার মনটা খারাপ হয়ে গেলো। বললাম অফিস আসতে পারো ফৃ থাকলে। সে তার এক বন্ধু নিয়ে (দুজনেই চারুকলায় পরীক্ষা দিয়ে চান্স পায়নি) আমাদের নিউ এইজ এর ক্যান্টিনে এলো। একেবারে ভেঙ্গে পড়া চেহারা। আমি আর কার্টুনিস্ট মিতু ছিলাম তখন। বেচারা জানালো সে সর্বোচ্চ ভাল পরীক্ষা দিয়েছিলো (এখানে বলে রাখি তার নিশ্চিত বিশ্বাস ছিলো সে ভর্তি পরীক্ষা প্রথম দিকে থাকবে রেজাল্ট এ)। কিন্তু কেন হলো না সেটা বুঝতে পারছে না। আমি যেহেতু এই লাইনের লোক না সেহেতু কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। তবে অসীম এর যেটুকু স্কিল আমি দেখেছি চারুকলায় ৫ বছর পড়েও এই স্কিল অর্জন করতে অনেকেই পারে না সেটা আমি দেখেছি। মানে যত খারাপ পরীক্ষাই দিক তার চান্স পাবার কথা সেটা আমিও ধরে রেখেছিলাম। যাই হোক বেচারা মন খারাপ করে জানালো কোন এক দাদা নাকি বলেছে বিশ্বভারতীতে এপ্লাই করতে। সেখানে নাকি কাজের স্যাম্পল পাঠালেই সেটার ওপর নাম্বারিং হয় আর পরে গিয়ে আবার আঁকতে হয়। স্কলারশিপের চান্স আছে। এবার আমি নড়েচড়ে বসলাম। মিতু আর আমি দুজনেই বললাম অবশ্যই সেটা কর। এক বছর বসে পরের বছর আবার চারুকলায় যে চান্স পাবাই তার গ্যারান্টি নাই, আর বাংলাদেশে পাশ করতে হলে তোমার সেশন জটে পড়তে হবে। ওখানে সেটা নাই। সেই সাথে আমাদের দূষিত লোকাল পলিটিক্স তোমাকে অনেক কিছু থেকেই বঞ্চিত করবে। শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে এডমিশন আর এডমিনিস্ট্রেশন এ যেভাবে দলাদলি চলছে অন্তত এটা ওখানে ততটা নাই। আর ওখানের ডিগ্রির দামও বেশী হবে। বিশ্বভারতীর ব্র্যান্ডিং অবশ্যই বেটার।

এর ক'দিন পরেই সুসংবাদ, অসীম ওখানে চান্স পেয়েছে। আমি মনে মনে বললাম শাপে বর আবার!

এর কিছুদিন পর আবার বিরক্ত লাগলো সে কোন একট সাইটে দেয়া সাক্ষাতকারে (তদ্দিনে তার ড্রয়িং অনেক ভাল হয়েছে, সেটা সাক্ষাতকার দেবার পর্যায়ে চলে গেছে, আমার দেখা সবচেয়ে দ্রুত ভাল করার মধ্যে আসিফুর রহমান রাতুলের পরেই অসীম চন্দ্র- মানে দ্রুততার দিক থেকে) সে বলেছে যে চারুকলার ভর্তি পরীক্ষায় ঘাপলা আছে (আমাদের শিক্ষামন্ত্রী শুনলে খুশী হয়ে যাবেন)। স্বাভাবিকভাবেই চারুকলার যত বন্ধু বান্ধব আছে(ন) সবাই এটাতে বিরক্ত হলেন। আমি চারুকলার মেধাবী ছাত্র সাদাত (কার্টুনিস্ট সাদাত) কে জিজ্ঞেস করলাম ব্যাপারটা আসলে কী? সে যেটা বল্ল সেটা আবার আরেক ঘটনা এবং সেটাও বিবেচনায় আনতে হবে। সে বলল 'মেহেদী ভাই, অসীম আমার কাছে আগে আসছিলো ভর্তি পরীক্ষার আগে, আমি দেখসি সে ওভার কনফিডেন্ট, আমি শুধু এইটুকু সতর্ক করছি যে দেখ ফাইন আর্টস ডিপার্টমেন্ট কিন্তু কার্টুনিস্টিক ডিস্টর্শন দেখলে ক্ষেপে। মানে পরীক্ষায় যা চাইবে সেটা সেভাবেই দিতে হবে, কার্টুন টাইপ করে বেশী ক্রিয়েটিভ করতে গেলে সেটায় গোল্লা দিতে পারে।' আমারো মনে হল এটা হতেও পারে। আসলে টেস্ট বা কনটেস্ট এর ব্যাপারটা কিন্তু আলাদা। যেমন আমি নিজে অনেক কার্টুন কন্টেস্ট এ কার্টুন জমা দিয়ে এমনকি কোন সান্ত্বনা পুরস্কার ও প্রাইজ পাই নি। এবং পরে দেখেছি আসলে সেটা কার্টুনটা খারাপ হয়েছে সে জন্যে না, টপিক এ যা চাওয়া হয়েছিলো সেটাকে ঠিকভাবে আমি বুঝি-ই নাই। যেমন হয়ত বল্ল ১৫"X১০" ইঞ্চি মাপে কার্টুন দিতে হবে আমি হয়ত সেটা খেয়ালই না করে অন্য মাপে দিলাম, ব্যাস সেটা বাদ। কী এঁকেছি সেটা দেখাই হবে না। যাই হোক আমি জানি না আসলে কী ঘটেছিলো, আর হতাশা থেকে অসীম সেটা বলতেই পারে কারণ অনেক 'হাতে পেন্সিল গো মাংস' টাইপ পোলাপান চারুকলায় দিব্যি চান্স পেয়ে গেছে সেবারেই। সুতরাং তার ক্ষোভ হতেই পারে। তার জায়গায় আমি থাকলে আর কিছু যে বলতাম না তা গ্যরান্টি নাই।

যাই হোক, এবার বছর ঘুরে এল। হঠাৎ ফেইসবুক এ অসীমের করা একটা কাজ দেখলাম, ফটোরিয়েলিস্টিক কাজে সাধারণত প্রাণ থাকে না, কিন্তু এই কাজটা অসাধারণ! আমি অনেক্ষণ তাকিয়ে দেখলাম। কী অনায়াসে সে ডিজিটাল মিডিয়া আয়ত্ত্ব করেছে, দেশে থাকলে সেদিন তাকে ডেকে নিশ্চিত কোথাও একটা টৃট এর ব্যবস্থা করতাম। ক্যারিকেচার আর পোর্ট্রেইট নিয়ে এত ডেডিকেটেড ড্রয়িং আগে আমাদের জেনারেশনের কেউ করেছে বলে আমি দেখিনি। বাংলাদেশে অসংখ্য ট্যালেন্ট আছে, কিন্তু সারাজীবন বিদেশী জিনিস ভাল শুনতে শুনতে তাদের আত্মবিশ্বাসে বিরাট ঘাটতি চলে এসেছে। দুই একজন তাই বিশ্বমানের কাজ করলে সেটা অসংখ্য ট্যালেন্টদের জন্যে একটা বড় রসদ। 
সাবাস অসীম!
আরো এগোও, চারুকলায় চান্স পাও নাই পরোয়া নাই, সেটা হয়ত তোমার জন্যে ভালই হয়েছে।

1 comment: