September 26, 2013

আসিফ কবীর চৌধুরী


ঢাকা কমিক্স ডাইজেস্টের কাজ করছি, মাহবুব ভাই আর আমি মুখ চোখ শক্ত করে প্রতিদিন গেটাপ দিচ্ছি। ডাইজেস্টটা পৌনঃপুনিক ভাগের মত শেষ হচ্ছে না। প্রতিদিনই ভাবি আজই শেষ হবে, কিন্তু শেষ হয় না। ওদিকে রোজা পার হয়ে ঈদ চলে আসছে। ডাইজেস্ট এর একটা বড় অংশই রিপৃন্ট, আগের কমিক্স আবার করে ছাপা হচ্ছে। নতুন করে দেবার মত সময় আঁকিয়েদের নেই। সবাই অনেক কিছু (অবশ্যই তা ড্রয়িং নিয়ে নয়) নিয়ে ব্যস্ত। যাই হোক আমরা টানা গেটাপ দিয়ে দিয়ে ক্লান্ত হয়ে এ যুগের এন্টারটেইনমেন্ট ফেইসবুক খুলে বসি। এমন ভাবে এক রাতে কাজের ফাঁকে ফেইসবুক খুলে আঁকান্তিসে একটা পোস্ট দেখলাম, আসিফ কবির চৌধুরীর। দেখে অবাক (হিংসা মিশ্রিত অবাক) হলাম। এর কাজ আমি আগেও দেখেছি। কিছুটা সব্য'দার স্টাইল ঘ্যাঁষা কাজ, কিন্তু এখানে দেখে মনে হল সে হঠাৎ অনেক এগিয়ে গেছে। আগের চেয়ে অনেক ম্যাচিওরড কাজ। মেসেজে জানালাম কাজটা ভালো হয়েছে, আর সে ডাইজেস্ট এর জন্যে পাঁচ পৃষ্ঠা কমিক্স করতে আগ্রহী কি না। সাথে সাথে রিপ্লাই এল-আগ্রহী,  এবং আশ্চরযের ব্যাপার এক সপ্তার মধ্যেই প্রায় পরো কাজ করে সে পাঠিয়ে দিল। আমি নিজে আঁকি তাই কাজ দেখে এইটুক বলা যায় যে এই কাজ এক সপ্তায় দেয়াটা কঠিন। আসিফ কবির পড়েন রাজশাহী চারুকলায়। সেখান থেকে আর কেউ এই ধরনের ডিজিটাল মিডিয়া ও হালের কনসেপ্ট আর্ট ঘ্যাঁষা কাজ করেন কি না আমার জানা নেই। সত্যি বলতে কাজ দেখে অভিভূত হলাম, কারণ টুকটাক একটা কনসেপ্ট আর্ট করা আর অর্ডারি একটা স্টোরি এঁকে কমিক্স করাটা এক না। অনেক বড় বড় কনসেপ্ট আর্টিস্ট এখনো একটা প্রোপার কমিক্স করে দেখাতে পারেন নি। তাকে প্রথামত একটা বিরাট ধন্যবাদ দিয়ে ডাইজেস্ট এর শেষে সেই পাঁচ পৃষ্ঠা বসিয়ে দিলাম,.চ্যাটিং এ কথোপকথন চলতে লাগলো। 

এক সপ্তা পর ডাইজেস্ট বের হলে তাকে ফোন দিতে গিয়ে থেমে গেলাম... তার আঁকায় তার নাম দেয়া হয়নি!! এর কোন অজুহাত হয় না। যতই তাড়াহুড়ার কাজ হোক না কেন এটা মেনে নেবার উপায় নেই। লজ্জ্বায় ফোন তো দূরে থাকুক কোনরকম যোগাযোগ বাদ দিয়ে ভাবতে লাগলাম কি চাপা মারা যায়। অনেক ভেবে কিছু না পেয়ে এসেমেস দিলাম- ভাই আপনার কমিক্স আপনা র নাম ছাড়া ছাপা হয়েছে। সাথে সাথে রিপ্লাই এল- 'ব্যাপার না, লোকে কাজটাই দেখবে।' এত স্মার্ট রিলাই দেখে মনটাই ভালো হয়ে গেল। জানালাম যে অন্তত সূচীতে তার নাম আঁকিয়ে হিসেবে দেয়া আছে। এত বড় একটা ডিজ্যাস্টার এত সহজে নেয়া মানুষটা (আমি হলে কি কি বলতাম তা আমার কাছের লোকেরা জানে) আসলে ভালো মানুষ।  যা এই সময়ে দূর্লভ। তখনই বুঝলাম এর সাথে কাজ করা যাবে।  ওদিকে দিন যায় মাস যায় পকেট ভোঁ ভোঁ, নতুন আঁকিয়েদের সম্মানী দেয়া যাচ্ছে না। আশে পাশের সবাইকে হাবিজাবি বুঝায়ে রাখা যাচ্ছে, কিন্তু রাজশাহীর আসিফ-আর নামটাও ছাপি নাই তার আঁকিয়ে সম্মানীয় না দিয়ে কতদিন অসম্মান করব সেটা বুঝতে পারছিলাম না। অবশেষে গত ২৩ তারিখ সেটা ক্লিয়ার করে ফোন দিলাম- সে তার সাথে প্রথম কথা।জানালো ডাইজেস্ট টা ভালো হয়েছে। ফোন রাখার পর জিজ্ঞেস করলাম আসছে ফেব্রুয়ারিতে একটা ২৪ পৃষ্ঠার কমিক্স করতে চান কি না। জবাব এল- 'এইটা দারুণ হবে। আমার এখন যে পর্যায় এতে চলবে তো?' জানালাম 'চলবে' মনে মনে বললাম-দৌড়াবে। পরের রিপ্লাইএ সে জানালো যে ২৬ তারিখ তার ঢাকা আসার কথা, আমার সাথে দেখা করা যেতে পারে। আমি পজিটিভ জানিয়ে রিমাইন্ডার দিলাম- আসিফ, রাজশাহী 05.30 pm। লেখাটা এ পর্যন্ত রাখতে পারলেই হত। কিন্তু আরো একটু লিখতে হচ্ছে, সেটা হল গতকাল সকাল আসিফ কবীর চৌধুরী মারা গেছে। নিজের চেয়ে ছোটো ও সমগোত্রীয় কেউ মারা গেলে কি ভয়ানক অবাক লাগে! আর তার সাথে যদি কিছু আগেই কথাবার্তা হয়ে গিয়ে থাকে। যার সাথে দেখা করার রিমাইন্ডার এখনো আমার ফোনে রাখা, আজ বিকেলে ঠিক ৫.৩০  এ সেটা বেজে উঠবে...

অন্যদের থেকে জানলাম ক্লাস শেষে বের হয়ে সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়, আর ক'দিন আগেই নাকি একটা লাংসজনিত সমস্যার কারনে মেডিক্যাল অপারেশন হয়ে গিয়েছহিল। অজ্ঞান অবস্থায় হাসপাতালে নেবার পড়ে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করে। এই এক বছরে আমি আমার দুইজন সহযাত্রী হারালাম। ফেব্রুয়ারিতে তারিকুল ইসলাম শান্ত ভাইয়ের সাথে কথা হল পরেরদিন বইমেলাতে কমিক্স নিয়ে কথা হবে, পরদিন শাহবাগ আন্দোলনে স্লোগানরত অবস্থায় হার্ট এটাকে মারা গেলেন। আর এবার যাকে কখনো এমনকী চোখের দেখাও হল না তার সাথে দেখা হবার আগের দিন সে নেই। গত কয়েকবছরে মৃত্যু দেখতে দেখতে আমি ক্লান্ত। প্রতিবার মোটামুটি সব কাটিয়ে উঠতে ন উঠতেই আবার আরেকটা সংবাদ...
যাই হোক, যে মারা গেছে তাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব না। আমরা যা করতে পারি তার স্মৃতিচারণ, এবং আসিফ কবির ছিল সেই মানের সম্বভানাময় একজন শিল্পী যার আসলে অনেক কিছু দেবার ছিল। বাংলাদেশের কমিক্স কার্টুন ও পেইন্টিং দুনিয়া অনেক অভূতপুর্ব কাজ থেকেও বঞ্চিত হল।
আর আমি বঞ্চিত হলাম এক ভালো মনের অসাধারণ প্রতিভাবান সহযোদ্ধার থেকে।
ভালো থাকুন আসিফ,

যেখানেই থাকুন।